কলি যুগের ধর্ম

by - February 11, 2021

 

            সাধারন মানুষ হিসাবে, যুগের সময়কাল ও তার ব্যাখ্যা করাটা নিতান্ত ছেলেমানুষি । ছোট মস্তিস্কে এত বড় গুন যোগ এর হিসাব ধরে না । এমনিতেই নানা মুনির নানা মত । সে বিজ্ঞান গত হোক আর ধর্মীয় শাস্ত্রের ব্যাখাই হোক। একটু ব্যাখ্যা করা যাক, আমরা জানি কলি যুগ হল হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী চার যুগের অন্তিম যুগ। বাকি যুগ গুলো হলো সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগ। কলি যুগের পারিমান আনুমানিক ৪,৩২,০০০ বছর, তাও এখন নাকি সবে কলির সন্ধ্যে। তাহলে কবে কলি যুগের শেষ তা কেউ জানে না । দ্বাপর যুগ, কলি যুগের দ্বিগুণ; ত্রেতা, কলি যুগের তিন গুন এবং সত্য যুগ, কলি যুগের চার গুন পরিমান । তাহলে এক চতুর্যুগ (মহাযুগ) মোট কত বছর ? 

সত্য যুগ - ১,৭২৮,০০০ বছর

ত্রেতা যুগ - ১,২৯৬,০০০ বছর

দ্বাপরযুগ - ৮৬৪,০০০ বছর

কলিযুগ - ৪৩২,০০০ বছর

       সাধু মুখে শোনা, বর্তমানে ২৭তম কলি যুগ চলছে। তার মানে ২৭টি সত্য যুগ, ২৭টি ত্রেতা যুগ, ২৭টি দ্বাপর যুগ ইতিমধ্যে তিবাহিত হয়েছে এবং এই কলি যুগের শেষে ২৮ তম সত্য যুগ এর সুচনা হবে । বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি । আবার নেক গ্রন্থে পাই, আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে দ্বাপর যুগে কৃষ্ণ এসেছিলেন । এই হিসাবটা খানিকটা সোজা-সাপটা । বর্তমানে একবিংশ শতাব্দী, তার আগে খ্রিষ্ট পূর্ব যোগ করলে আনুমানিক একটা হিসাব বেরিয়ে আসে । কিন্তু নিশ্চিত কিছু পাওয়া যায় না। এই ৫০০০ বছর যদি কলির সন্ধ্যে হয়, তাহলে কলিযুগের আয়ু কত দাঁড়াবে? হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। তবে এটাও সত্যি, মানুষ ও বিজ্ঞানের সবকিছু বোধগম্য নয়। জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভিজ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞান । বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান, বিজ্ঞানের ঘরে বসে ভিজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান জানা সম্ভব নয়। একটা সাধারন ব্যাপার, ভগবানের আবির্ভাব কালই হল যুগ সন্ধিক্ষন অর্থাৎ নতুন যুগের সূচনা। তার কোনো সময় নির্দিষ্ট থাকে না। ধর্মের উপর আঘাত এবং সাধুদের পরিত্রান করার জন্য যুগে যুগে তিনি ধরাধামে আবির্ভূত হন এবং নতুন যুগের উৎপত্তি হয় । 

কলি যুগের আচার-আচরণ 

            যদিও কলি যুগ নিয়ে এরমধ্যে অনেক ব্লগ লেখা হয়েছে, তাই খুব বেশি বিস্তারিত না বলে একটুআধটু স্মৃতিচারণ করছি। বেদব্যাস রচিত বিষ্ণু পুরাণ বলা হয়েছে যে কৃষ্ণের পৃথিবী ত্যাগ করে স্বর্গারোহণের সময় থেকে পৃথিবীতে কলি যুগের সূচনা হয়েছে। এই যুগে পুণ্য এক ভাগ, পাপ তিন ভাগ। ভগবানের অবতার কল্কি রূপে । মানুষের গড় আয়ু একশো বছর প্রায়। নিজের হাতে সাড়ে তিন হাত নিজের শরীরের আয়তন। প্রাণ অন্নগত, মন যোনিগত । তীর্থ গঙ্গা স্নান । ধর্ম সংকোচিত । মানুষ তপস্যাহীন, সত্য থেকে দূরে থাকবে । কুটিল রাজনীতি, ধনলোভী শাসক, শাস্ত্রহীন ব্রাহ্মণ-এ পরিপূর্ণ হবে । পুরুষ স্ত্রীর অনুগত, পাপে অনুরক্ত । সৎ মানুষের কষ্ট বৃদ্ধি । দুষ্টের প্রভাব বৃদ্ধি । 

                'বিষ্ণু পুরাণ' অনুযায়ী ব্রহ্মদেব সত্যযুগে সমস্ত সৃষ্টিকর্ম করেন এবং কলিতে সমস্ত সৃষ্টি উপসংহার টেনে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। বিষ্ণু পুরাণ মতে কম ধনের অধিকারী হয়ে মানুষ এ যুগে বেশি অহংকার করবে। ধর্মের জন্য অর্থ খরচ করবে না এবং ধর্মগ্রন্থের প্রতি মানুষের আসক্তি থাকবে না। মাতাপিতাকে অসম্মান এবং অনাধিকার চর্চা করবে । পুত্র পিতৃহত্যা বা পিতা পুত্র হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করবে না। মানুষ বৈদিক ক্রিয়া আচার পালন করবে না। ধর্মানুসারে কেউ বিবাহিত থাকবে না। আর্থিকভাবে দুর্বল পতিকে স্ত্রীরা ত্যাগ করবে, আর ধনবান পুরুষরা সেই স্ত্রীগণের স্বামী হবে। কলিযুগে ধর্মের জন্য ব্যয় না করে কেবল গৃহাদি নির্মাণে অর্থ ব্যয় করবে। মানুষ পরকালের চিন্তা না করে কেবল অর্থ উর্পাজনের চিন্তাতেই নিরন্তর ডুবে থাকবে। কলিযুগে নারীরা সাধারনতঃ স্বেচ্ছাচারিণী ও বিলাস বস্তুতে বেশি অনুরাগিণী হবে এবং পুরুষরা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করবে। নারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি হবে এবং শুনতে হাস্যকর হলেও নারীদের তাড়ায় পুরুষেরা গাছে উঠবে। সুন্দরী নারীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে, যা ধ্বংসের অন্যতম কারণ হবে। অসমর্থ মানুষরা ধনহীন হয়ে সর্বদা দুর্ভিক্ষ ও ক্লেশ ভোগ করবে। কলিকালে মানুষ স্নান না করে ভোজন করবে। কলিকালে স্ত্রীলোকরা খুব লোভী হবে, অনেক ভোজনশীল হবে। নারীরা দেহ পোষণে ব্যস্ত থাকবে, সর্বদা কঠোর ও মিথ্যা কথা বলবে। 

                আচারহীন ব্রাহ্মণপুত্ররা ব্রহ্মচারীর বেশ ধরে বেদ অধ্যয়ন করবে। গৃহস্থরা হোমাদি করবেন না এবং উচিত দানসামগ্রীও প্রদান করবেন না। মানুষ অশাস্ত্রীয় তপস্যা করবে। কলিকালে ৮ থেকে ১০বছরের বালকেরা সহবাসে ৫ থেকে ৭বছর বয়সের বালিকারা সন্তান প্রসব করবে। মানুষের বুদ্ধি অতি অল্প ,তাঁদের ইন্দ্রিয়-ইচ্ছা অতিশয় কুৎসিত, তাদের মন অতিশয় অপবিত্র হবে। আর অল্প কালেই বিনাশ লাভ করবে। যখন পাষন্ড লোকের প্রভাব অত্যন্ত বাড়বে, তখন সমাজের ভালো লোক কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকবে না। সজ্জনের হানি লক্ষ্য করা যাবে । অল্প বৃষ্টি হবে, কলিযুগে ফসল কম হবে। সুন্দরী স্ত্রীর যার তার সাথে বন্ধুত্ব হবে, নিজ ভাইয়ের সাথে শত্রুভাব পোষন করবে। দিন দিন মানুষ খর্বাকায় অর্থাৎ উচ্চতায় ছোট হবে, শেষে বেগুন গাছে লগা দিয়ে বেগুন পারবে। সমাজে কোনো শ্রেণীবিভাগ থাকবে না। ......... এককথায় কলির কান্ড, লন্ডভন্ড।  

কলি যুগের মাহাত্ম্য

             কল্কি অবতার কলিযুগের শেষে আর্বিভাব ঘটবে। শম্ভল নামক গ্রামে সুমতি নামে ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে বিষ্ণুযশা নামে ব্রাহ্মণের গৃহে কল্কি নামে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতারের আর্বিভাব ঘটবে। কল্কি হবে বিষ্ণুযশা-সুমতির ৪র্থ সন্তান। বিষ্ণুযশা-সুমতির প্রথম ৩ সন্তানের নাম হবে যথাক্রমে কবি, প্রাজ্ঞ আর সুমন্তক। ভাগবতে বলা আছে ছলনা মিথ্যা আলস্য নিদ্রা হিংসা দুঃখ শোক ভয় দীনতা প্রভৃতি হবে কলিযুগের বৈশিষ্ট্য। এই কলিযুগে কৃষ্ণনাম জপ ও কালীনাম ভজনাই জীবকে উদ্ধার করতে পারে। মনু সংহিতায় বলা হয়েছে যে সত্যযুগে তপস্যা, ত্রেতায়ুগে জ্ঞান, দ্বাপরয়ুগে যজ্ঞ এবং কলিতে দান ও নাম সংকীর্তনই প্রধান । 

            কলিযুগ এত বৈচিত্রপূর্ণ ও নিম্ন হলেও, কলিযুগের মতো মহান যুগ আর হয় না। সত্যযুগে তপস্যা, ত্রেতায়ুগে জ্ঞান, দ্বাপরয়ুগে যজ্ঞ এবং কলিতে শুধুমাত্র নাম সংকীর্তনের দ্বারা (তারক ব্রহ্মনাম - হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে) জীব উদ্ধার হবে। এরই মধ্যে ভগবান বুদ্ধ ও মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব তাঁহাদের লীলা সম্পন্ন করেছেন এবং জীবনের চলার পথে তাঁদের অমূল্য নীতি, উপদেশ ও ভক্তির পথ প্রদর্শন করেছেন। মহাপ্রভু জানতেন কলির হতভাগ্য জীব ভক্তিভরে নামটুকুও নিতে পারবে না। তিঁনি স্বয়ং প্রেমের ঠাকুর হয়েও, কঠোর সন্ন্যাস ধৰ্ম পালন করেছিলেন। "সন্ন্যাসী রূপে যদি মোরে করে নমস্কার, তথাপি ঘুচিবে জীবের সকল দুঃখ যে অপার। " তাই তো তিঁনি পাতিতপাবন হরি। আসুন ভক্তিভরে একটিবার তাঁর নাম করি ........ 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ 
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে 
হরে রাম হরে রাম 
রাম রাম হরে হরে


You May Also Like

0 comments