কালচক্র :: সামাজিক ও পরিবেশের পরিবর্তন
কেমন যেন সব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আমাদের চারিপাশটা। খুব বেশি পিছনে যেতে হবে না, যাদের বর্তমান বয়স ৪০ কি ৫০, তারা যদি নিজেদের শৈশব টা একটু ফিরে দেখেন, আর আজকের শৈশব লক্ষ্য করুন দেখবেন কত ফারাক। লেখাপড়ায়, খেলাধুলায়, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় সবকিছুতে বিস্তর পার্থক্য। একান্নবর্তী পরিবার আজ দুরবিন দিয়ে খুঁজতে হয়, তবে অবশ্যই একাকীত্ত্ব ও ছোট পরিবার আজ প্রায় সবার পছন্দ। শিক্ষক আজ ছাত্রদের শাসন করার অধিকার হারিয়েছে, প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন অভিভাকরা। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষকদেরও অমানুষিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। শিক্ষক ও ছাত্রীর অবৈধ সম্পর্ক আজকাল খবরের কাগজের শিরোনাম। আমি অন্তত আমার ছাত্রজীবনে এরকম শুনিনি। অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে, আজকাল ঠিকমত হাটা যায় না, এমনিই দৃষ্টি-দূষণ পরিবেশ। আজ যারা পিতামাতা, শিক্ষক, বা বয়স্ক মানুষদের সন্মান দিচ্ছে না, তারা তাদের ভবিষ্যতে কি আর সন্মান পাবেন?
স্বামীজি বলেছিলেন, একটু কম পড়ে, বেশি খেলাধুলা ও শরীর চর্চা করতে। সবাই জানেন বর্তমানে শতকরা হিসাবে সংখ্যাটা একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। শৈশব ও কিশোর আজ মোবাইল ও ইন্টারনেট জগতে আটকে গেছে। যারফলে তাদের ইমিউন পাওয়ার অনেক কম, খুব সহজে রোগের শিকার হচ্ছে।
আর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সন্মান করার পাঠ প্রায় চুকে যাচ্ছে । এই তিনটি শব্দ কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবারে, কিছু মঠ মিশনে অবশিষ্ট আছে। সাধারণ ঘরে, স্কুল-কলেজে আজ শুধু রাজনীতি আর ব্যাক্তিগত স্বার্থ। যেই হারে পরিবর্তন হচ্ছে, আজ থেকে ১৫-২০ বছর পর কি দেখতে হবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।
যেখানে ১৮ এর দশকে বিশ্বের লোকসংখ্যা ১০০ কোটি ছিল, আজ ২০২০-২১ সালে সেই লোকসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি, এই হারে ২০৫০-৬০ সালে, লোকসংখ্যা ১৫০০ কোটিতে পৌঁছাবে। ভবিষ্যতে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাসস্থান ও খাদ্যের ঘাটতি অনিবার্য। অরণ্য ও জন্তু জানোয়ার প্রায় নিশ্চিন্ন না হয়ে যায়। অপরদিকে, ভারত মহাসাগরের জল সাধারণ ভাবে আগে ২৩-২৪ ডিগ্রী তাপমাত্রা থাকত, সেখানে এখন প্রায় ৩১-৩২ ডিগ্রী ছুঁয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন আরো বাড়বে, আরো ঘন ঘন টর্নেডোর উৎপত্তি হবে, তা বলা বাহুল্য।
অপরদিকে কাম ও লোভের বশবর্তী হয়ে ঈশ্বরের সৃষ্টি এই সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবীটাকেও শেষ করতে আমরা পিছপা হচ্ছি না। একদিকে বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশ দূষণ ও বনছেদন করে বিশ্ব-উষ্ণায়ন বৃদ্ধি; অন্যদিকে, শুধুমাত্র মুনাফার লোভে ধংসাত্মক অস্ত্রের পরীক্ষা ও সেগুলো অন্যদেশে বিক্রি; মানুষ হয়ে মানুষ মারার ভাইরাস আবিষ্কার। কারণ এই ভাইরাস মারতে তারাই এন্টিডোস ও ঔষধ তৈরি এবং বিক্রি করে মুনাফা লুটবে। বাহ্ রে! উন্নত ও প্রগতিশীল মানুষ ও তাদের সমাজ। সব জেনেও আমরা শুধুই নীরব দর্শক । পৃথিবীতে প্রথম ক্ষমতাশালী দেশ হবার কি সুন্দর প্রতিযোগিতা! দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন, সুপার সাইক্লোন, বিভিন্ন মারণ রোগের মহামারী, অতিবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ, কোথাও অনাহারে মানুষ মরছে - এই সবের জন্য আমরা অন্য কাউকে দোষ দিতে পারি কি? নাকি সব কালচক্রের প্রভাব?
তবে এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, অবশ্যই ব্যাতিক্রম আছে। পৃথিবী কোনোদিন ভালো মানুষ শূন্য হয়নি, আর হবেও না। নাহলে পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যেত।
কালচক্র
কালচক্রকে এক কথায় কিছু বলা যাবে না। এমনিতেই আমি একজন সামান্য ক্ষুদ্র ব্যাক্তি, এতো গভীর অর্থ প্রকাশ হয়তো আগামী কয়েকজন্মেও করতে পারবো না। যাই হোক, কিছু লিখতে হবে তাই লেখা। সময়ের একটি কালচক্র, জীবন-মৃত্যুর একটি কালচক্র, গ্রহ-নক্ষত্রের একটি কালচক্র প্রভৃতি নানারকম ভাবে কালচক্রকে ব্যাখ্যা করা যেতেই পারে। তবে আমি এইস্থানে সময়ের কালচক্র-এর উপর দাঁড়িয়ে একটু বলার চেষ্টা করবো। এতক্ষন যা কিছু লিখেছি তা সময়ের সাথে মানুষের, পরিবেশের ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে। আগেই বলেছি আমরা সময়ের সাথে শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক মুনাফার জন্য নিজেরাই পরিবর্তন হয়ে গেছি। ভালো মন্দের বিচার একরকম চলে যাচ্ছে। অপরদিকে ধর্ম বলছে এই সময় যা হচ্ছে তা ভবিতব্য অর্থাৎ আগেই লিপিবদ্ধ করা আছে। আবার এও ঠিক পৃথিবীতে অধর্ম যখন বৃদ্ধি পায়, ঈশ্বরের বা তার অংশের অবতারের আগমন হয়। এটা মোটামুটি সব ধর্মেই বলা আছে।
যদিও বিভিন্ন গ্রহের কালচক্র, দেবলোকের কালচক্র, পৃথিবীর কালচক্র আলাদা আলাদা। ধর্মের কথায় যখন স্বয়ং ভগবান আসেন, তখন নতুন যুগের সূচনা হয়। অর্থাৎ সময়ের কালচক্র-এর পরিবর্তন হয়। কিন্তু এর কোনো সঠিক সময় থাকে না। যেদিন ভগবান অবতীর্ন হবেন, সেদিন যুগধর্মের পরিবর্তন হয়। সূক্ষ্ম বিচারে বোঝা যায় যে, সব কিছুই যেন কারোর ইশারায় চলছে। মানুষ শুধুমাত্র উপলক্ষ্য। আমরা এইসব না মেনে, কর্মের ভিত্তিতে (অহংকার, লোভ) কর্মফল ভোগ করি। আমরা প্রায়শই ভুলে যাই সব সময়ের খেলা। একটা প্রবাদ আছে না - সময় কথা বলে।
![]() |
| অদৃশ্য ব্রহ্মান্ড |




0 comments